ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক:
বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক এবং খাবারের অপচয় কমাতে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথি উপস্থিত হলে অতিরিক্ত প্রতি অতিথির জন্য নির্দিষ্ট হারে ট্যাক্স আরোপ করা যেতে পারে। তার এই মন্তব্য ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ প্রস্তাব তুলে ধরেন।
অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ
আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক, নাচ-গান এবং খাবারের ব্যাপক অপচয় হয়ে থাকে। অনেক অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ খাবার প্রস্তুত করা হলেও তার একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, সমাজে ক্রমবর্ধমান ভোগবিলাস ও অপচয়ের সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত ব্যয় কমানো গেলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তার ভাষায়,
“আগে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন ছিল। আমরা চাই, ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে অতিরিক্ত প্রতি অতিথির জন্য এক হাজার টাকা ট্যাক্স নেওয়া হোক।”
১০০ জনের বেশি অতিথি হলে অতিরিক্ত ট্যাক্সের প্রস্তাব
বিএনপির এই সংসদ সদস্যের প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথি উপস্থিত হলে অতিরিক্ত প্রত্যেক অতিথির জন্য ১ হাজার টাকা করে কর আরোপ করা যেতে পারে।
তার মতে, এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা হলে মানুষ অপ্রয়োজনীয় বড় আয়োজনের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রতি উৎসাহিত হবে। এর ফলে সামাজিক অপচয় কমবে এবং অতিরিক্ত ব্যয়ও হ্রাস পাবে।
দ্রব্যমূল্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাবের দাবি
শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, দেশে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য ব্যবহার হয়, যার একটি বড় অংশ অপচয়ের কারণে নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এই অপচয় কমানো গেলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর চাপ কমবে। তার মতে, এর ফলে দ্রব্যমূল্য প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
যদিও তার এই বক্তব্য নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বক্তব্যটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধে কোনো না কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, সমাজে প্রদর্শনমূলক ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, যা অনেক পরিবারকে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপে ফেলে। তাই সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে, অনেকেই এ প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছেন, একটি পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে কতজন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তা ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়। সেখানে অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব নতুন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এমন নীতি বাস্তবায়ন করা হলে সেটি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং এর প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় কমানোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধুমাত্র কর আরোপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে কি না, সে বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
তাদের মতে, খাদ্য অপচয় কমানো এবং সামাজিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য জনসচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অধিক কার্যকর হতে পারে।
অতীতে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন
বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন সময়ে অতিথি নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধের আলোচনা হয়েছিল। তবে বর্তমানে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথির সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনো কার্যকর আইন নেই।
শাহাদাত হোসেনের বক্তব্যে সেই পুরোনো ধারণার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নয়
উল্লেখ্য, বিয়েতে ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে ট্যাক্স আরোপের বিষয়টি বর্তমানে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা নীতিগত ঘোষণা নয়। এটি একটি আলোচনা সভায় দেওয়া একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রস্তাব।
তবে তার এই মন্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে নানা মতামত সামনে আসছে।
সব মিলিয়ে, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় কমাতে ১০০ জনের বেশি অতিথির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাবটি নতুন করে সামাজিক ব্যয়, খাদ্য অপচয় এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
