উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তিস্তা নদী। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নদীটির নাব্যতা সংকট, পানির স্বল্পতা, ভয়াবহ ভাঙন এবং বন্যার কারণে তিস্তা তীরবর্তী লাখো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসন এবং তিস্তা অববাহিকায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা পাড়ের মানুষ।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টায় কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা রেলসেতু এলাকায় আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিস্তা পাড়ের মানুষের মৌলিক অধিকার বাঁচাও যুব পরিষদ, কাউনিয়া এ দাবি জানায়। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে তিস্তা নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন এবং সরকারের কাছে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা মো. আব্দুর রহিম বলেন, “তিস্তা শুধুমাত্র একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ, বসতি এবং মানুষের জীবিকা—সবকিছুর সঙ্গে তিস্তার অস্তিত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ দীর্ঘদিন ধরে নদীটির সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে একই নদী কখনো বন্যার মাধ্যমে ধ্বংস ডেকে আনে, আবার কখনো পানিশূন্যতার কারণে জীবিকা সংকট সৃষ্টি করে।
স্থানীয়দের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নই হবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। নদীর ভাঙন নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তারা বলেন, তিস্তা অববাহিকার চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকাগুলো এখনো শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে তিস্তা নদীর নামে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ পাবে এবং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যদি কোনো পরিবারের জমি বা বসতভিটা অধিগ্রহণ করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ও বাজারমূল্যভিত্তিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায় না, যা নতুন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই শুরু থেকেই এ বিষয়ে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
স্থানীয় নেতারা মনে করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধুমাত্র নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি বড় সুযোগ। তারা বলেন, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি, শিল্পায়নের প্রসার এবং বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনার সঙ্গে এসব বিষয়কে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না; বরং দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখতে চান। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার আহ্বান জানান তারা।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, তিস্তা নদীর কারণে তারা যেমন সমস্যার মুখোমুখি হন, তেমনি নদীটির সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে এই অঞ্চল উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এ সময় সাংবাদিক সম্মেলনে মো. জহুরুল হক, মো. আব্দুল হান্নান, মো. রমজান আলী, রফিকুল ইসলাম, মো. মোর্তাজ আলী, মো. শামসুল হকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, তিস্তা অববাহিকার মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং তিস্তা নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের আহ্বান জানান। তাদের প্রত্যাশা, তিস্তা বাঁচলে শুধু একটি নদী নয়, বদলে যাবে পুরো জনপদ; বদলে যাবে লাখো মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ।
