বরিশালে সহপাঠীর বডি স্প্রের গন্ধে অসুস্থ ১৪ শিক্ষার্থী, হাসপাতালে ভর্তি ৩

ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীর ব্যবহৃত বডি স্প্রের গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়েছে নবম শ্রেণির অন্তত ১৪ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে তিনজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আকস্মিক এ ঘটনায় বিদ্যালয়জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়নের শিবপুর পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত

বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ব্যাগে থাকা ‘ওয়াইল্ড স্টোন’ ব্র্যান্ডের একটি বডি স্প্রে ব্যবহার করার পর প্রথমে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরা শুরু হলে সহপাঠীরা তাকে ঘিরে ফেলে। কিছু সময়ের মধ্যেই আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একই ধরনের উপসর্গ অনুভব করতে শুরু করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকজন শিক্ষার্থী বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় আক্রান্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো শ্রেণিকক্ষে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অসুস্থ শিক্ষার্থীদের পরিচয়

অসুস্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিথি আক্তার, মারুফ খান, তানজিলা আক্তার, সারা মনি, তাজু, মাহিন, সুমাইয়া, ইশরাত, সাদিয়া, লামিয়া, অন্তরা ও জিসান। বাকি দুই শিক্ষার্থীর পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

তারা সবাই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

শিক্ষার্থীদের বর্ণনা

অসুস্থ শিক্ষার্থী মারুফ খান জানায়, তাদের সহপাঠী তাওসিফের ব্যাগে থাকা বডি স্প্রেটি ব্যবহার করার কিছুক্ষণ পর প্রথমে বিথি আক্তার অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সে বলে,

“আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ওর শরীর খারাপ করেছে। কিন্তু পরে একে একে আরও কয়েকজন একই ধরনের সমস্যা অনুভব করতে শুরু করে। তখন সবাই ভয় পেয়ে যায়।”

অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও জানান, সহপাঠীদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় এবং কেউ কেউ কান্নাকাটি শুরু করে।

বিদ্যালয়ে আতঙ্কের পরিবেশ

ঘটনার পর পুরো বিদ্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

অনেক শিক্ষার্থী ভয়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে অভিভাবকরাও বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন।

কিছু সময়ের জন্য বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হান্নান মিয়া জানান, শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকরা তাদের প্রাথমিক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন,

“হঠাৎ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা দ্রুত তাদের বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠাই। পরে তিনজনের অবস্থা কিছুটা খারাপ হওয়ায় তাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।”

তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ

বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সুজিত চন্দ্র ঢালি বলেন, অসুস্থ শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশই এখন শঙ্কামুক্ত।

তিনি জানান,

“শুধু একটি বডি স্প্রে ব্যবহারের কারণে একসঙ্গে এত শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়া সাধারণ ঘটনা নয়। এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক বা গণ-আতঙ্কজনিত কারণ থাকতে পারে।”

তার মতে, কোনো শিক্ষার্থীকে অসুস্থ হতে দেখে অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনাকে ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস (Mass Psychogenic Illness) বা গণ-আতঙ্কজনিত অসুস্থতা বলা হয়।

কী এই ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস?

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে একজন ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্যরা ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক চাপে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ অনুভব করতে পারেন।

বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ঘটনা বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ অনুভব করা, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা সাময়িক অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তদন্তে নেমেছে প্রশাসন

ঘটনার পর পুলিশ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে।

বাকেরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন,

“আমরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছি। বডি স্প্রেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তারা অভিভাবকদেরও গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

অভিভাবকদের উদ্বেগ

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের সামনে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়।

একাধিক অভিভাবক বলেন, সন্তানদের এমনভাবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পেয়ে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

তারা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞদের মত

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, আতঙ্ক কমানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তাদের মতে, আতঙ্কজনিত পরিস্থিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই শিক্ষক ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

হাসপাতালে ভর্তি তিন শিক্ষার্থীর অবস্থাও আগের চেয়ে ভালো বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শিবপুর পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীর ব্যবহৃত একটি বডি স্প্রেকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। যদিও চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, এর পেছনে গণ-আতঙ্কজনিত প্রভাব থাকতে পারে, তবুও প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *