আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে দক্ষিণ ধর্মেশ্বরে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ও বর্ণাঢ্য র‍্যালি অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, কাউনিয়া (রংপুর):

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ ধর্মেশ্বরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা সভা এবং বর্ণাঢ্য মাদকবিরোধী র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে শুক্রবার (২৬ জুন) জুমার নামাজের পর দক্ষিণ ধর্মেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকায় এক সচেতনতামূলক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা মাদকের কুফল, তরুণ সমাজের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব এবং মাদক প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাউনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শিহাব উদ্দিন। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন আলহাজ আব্দুল মজিদ, চেয়ারম্যান, ৩ নম্বর কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদ। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. আলতাফ হোসেন, সভাপতি, ৩ নম্বর কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দক্ষিণ ধর্মেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন

মাদক সমাজের জন্য বড় হুমকি

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি। মাদকাসক্তি মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

তারা বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, তরুণ সমাজকে খেলাধুলা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ, আর তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

নারী মাদক ব্যবসায়ীদের সতর্কবার্তা

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ৩ নম্বর কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুল মজিদ বলেন, তার কাছে কুর্শা ইউনিয়নের কিছু নারী মাদক ব্যবসায়ীর তথ্য রয়েছে।

তিনি বলেন,

“আমি কুর্শার কয়েকজন নারী মাদক ব্যবসায়ী সম্পর্কে জানি। আমি তাদেরকে এখনই সতর্ক করছি এবং ভালো পথে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা যেন দ্রুত এ পথ থেকে সরে আসে।”

তিনি আরও বলেন,

“কেউ যদি সতর্ক হওয়ার পরও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যায়, তাহলে প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

তার এ বক্তব্য উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং অনেকেই মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

ওসির মাদকবিরোধী বার্তা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কাউনিয়া থানার ওসি মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, মাদক সমাজের জন্য একটি নীরব ঘাতক। এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে এবং সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন,

“মাদক নির্মূলে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্য, শিক্ষক এবং সমাজের সচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। সমাজের সবাই একসঙ্গে কাজ করলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব।

বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে জনসচেতনতার বার্তা

আলোচনা সভা শেষে একটি বর্ণাঢ্য মাদকবিরোধী র‍্যালি বের করা হয়।

র‍্যালিটি দক্ষিণ ধর্মেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ থেকে শুরু হয়ে এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় অনুষ্ঠানস্থলে এসে শেষ হয়।

র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার এবং ফেস্টুন বহন করেন। এ সময় তারা—

  • “মাদককে না বলুন”
  • “মাদকমুক্ত সমাজ গড়ি”
  • “সুস্থ যুব সমাজ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ”
  • “মাদক ছাড়ুন, সুন্দর জীবন গড়ুন”

ইত্যাদি সচেতনতামূলক স্লোগান প্রদর্শন করেন।

সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ

অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

অনেকেই বলেন, মাদকবিরোধী এমন কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা হলে তরুণ সমাজের মধ্যে সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং মাদক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন শক্তিশালী হবে।

মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার

কর্মসূচির শেষে উপস্থিত সবাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বক্তারা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং আগামী প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দক্ষিণ ধর্মেশ্বরসহ পুরো কাউনিয়া উপজেলাকে একদিন মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *