ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক:
ভালোবাসার কোনো সীমান্ত নেই—এই বহুল প্রচলিত কথারই যেন বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন চীনের নাগরিক লি বিং ও যশোরের তরুণী তন্দ্রা খাতুন। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং হাজারো মাইলের দূরত্ব পেরিয়ে ভালোবাসার টানে বাংলাদেশে এসে তন্দ্রাকে বিয়ে করেছেন লি বিং। বিয়ের আগে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন নবদম্পতি।
এই ব্যতিক্রমী প্রেম ও বিয়ের গল্প এখন যশোরের স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে। বিদেশি এই জামাইকে একনজর দেখতে প্রতিদিনই নববধূর বাড়িতে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের প্রেমের গল্প নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, তন্দ্রা খাতুন যশোর সদর উপজেলার বাউলিয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মন্টু মোল্লার মেয়ে। তিনি যশোর সদর উপজেলা তথ্যকেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে, লি বিং চীনের একজন নাগরিক। ভিন্ন দুই দেশের এই দুই মানুষের পরিচয় হয়েছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে, যা পরে ভালোবাসায় রূপ নেয়।
তন্দ্রা খাতুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা শেখার জনপ্রিয় অ্যাপ ‘হ্যালোটক’ (HelloTalk)-এর মাধ্যমে তাদের প্রথম পরিচয় হয়। শুরুতে তারা একে অপরের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করতেন। এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগের পরিধি বাড়তে থাকে এবং তারা ‘উইচ্যাট’ (WeChat)-এ নিয়মিত কথা বলা শুরু করেন।
তন্দ্রা বলেন, “প্রথমে আমরা বন্ধু ছিলাম। পরে একে অপরকে আরও ভালোভাবে জানতে শুরু করি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর আমরা বুঝতে পারি যে আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”
তিনি আরও জানান, প্রায় আট মাস ধরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। এই সময়ে তারা একে অপরের পরিবার, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৮ জুন লি বিং বাংলাদেশে আসেন। পরদিন সন্ধ্যায় দুই পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয়দের উপস্থিতিতে পারিবারিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
নবদম্পতির দাবি, বিয়ের আগে লি বিং স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর ইসলামী বিধান অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তাদের এলাকায় বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। তাই এই বিয়ে নিয়ে মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নববধূর বাড়িতে আসছেন বিদেশি জামাইকে দেখার জন্য।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, “শুনেছি চীনের একজন ছেলে আমাদের গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করেছে। বিষয়টি সত্যিই ব্যতিক্রমী। তাই আমরা তাকে দেখতে এসেছি। তাদের জন্য অনেক শুভকামনা রইল।”
আরেক বাসিন্দা শামসুন্নাহার বলেন, “ভালোবাসা যে দেশ-বিদেশ মানে না, এই ঘটনাটি তার প্রমাণ। মেয়েটি এবং তার পরিবার খুব খুশি। আমরাও তাদের নতুন জীবনের জন্য দোয়া করি।”
পরিবারের সদস্যরাও এই বিয়ে নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, শুরুতে বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে কিছুটা দ্বিধা ছিল। তবে পরে লি বিংয়ের আচরণ, আন্তরিকতা এবং পরিবারের প্রতি সম্মানবোধ দেখে তারা বিয়েতে সম্মতি দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ভাষা শেখার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে বিয়ের ঘটনা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন ধরনের আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্কের সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে তারা মনে করেন, ভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বিয়ে হলে সংস্কৃতি, ভাষা, পারিবারিক রীতি-নীতি এবং জীবনধারার পার্থক্য সম্পর্কে আগে থেকেই পরস্পরের পরিষ্কার ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং ধৈর্য থাকলে এ ধরনের সম্পর্ক সফল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও লি বিং ও তন্দ্রার বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই তাদের ভালোবাসার গল্পকে ‘সীমান্ত পেরিয়ে ভালোবাসার জয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নতুন দম্পতির জন্য শুভকামনা জানিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন।
স্থানীয়দের মতে, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার দুই মানুষের এই মিলন শুধু একটি বিয়ে নয়, বরং দুই দেশের সংস্কৃতির মধ্যেও একটি সুন্দর বন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, চীনের নাগরিক লি বিং ও যশোরের তরুণী তন্দ্রা খাতুনের প্রেম ও বিয়ের গল্প এখন স্থানীয় মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির দুই মানুষের এই ভালোবাসার পরিণতি অনেকের কাছেই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী ঘটনার উদাহরণ হয়ে থাকবে।
