অসুস্থ হয়েও ছুটি মেলেনি, কারখানাতেই নারী শ্রমিকের মৃত্যু; শ্রীপুরে বিক্ষোভ

কাউনিয়া ইনসাইডার ডেস্ক:

গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় লিজা আক্তার নামে এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সহকর্মীদের অভিযোগ, অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি এবং জোরপূর্বক কাজ করানো হয়েছিল। পরে কর্মরত অবস্থায় তিনি অজ্ঞান হয়ে যান এবং রাতের কোনো এক সময় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার সামনে বিক্ষোভ করেন এবং কয়েক ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে রাখেন।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি এলাকার কালার কো লিমিটেড কারখানায় এ ঘটনা ঘটে।

অসুস্থ অবস্থায়ও কাজের অভিযোগ

সহকর্মী শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতের শিফটে দায়িত্ব পালন করতে এসে লিজা আক্তার শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন। তিনি কয়েকবার কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির আবেদন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে তার সেই আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি।

শ্রমিকদের দাবি, শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থাতেও তাকে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে তিনি কর্মস্থলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে যান এবং পরে অজ্ঞান হয়ে যান।

শ্রমিক শোভা খাতুন বলেন,

“লিজা রাতে খুব অসুস্থ ছিল। সে কয়েকবার ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি। কাজ করতে করতেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। সকালে জানতে পারি, সে আর বেঁচে নেই।”

এই ঘটনার পর কারখানার অন্যান্য শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সকালে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা

বৃহস্পতিবার সকালে লিজা আক্তারের মৃত্যুর খবর কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, সময়মতো চিকিৎসা ও ছুটি পেলে হয়তো লিজার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।

অনেক শ্রমিকের দাবি, পোশাক কারখানাগুলোতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ এবং অসুস্থ শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণের অভিযোগ নতুন নয়। লিজার মৃত্যু সেই দীর্ঘদিনের অভিযোগকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ

ঘটনার প্রতিবাদে সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকরা কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা মাওনা-বরমী আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন।

দুপুর পর্যন্ত চলা এ অবরোধের কারণে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

বিক্ষোভকারীরা লিজা আক্তারের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং কারখানায় শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অতিরিক্ত কাজ ও হয়রানির অভিযোগ

বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকরা কারখানার ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং শ্রমিকদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

তাদের মতে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যা কর্মপরিবেশকে আরও কঠিন করে তোলে।

কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এ বিষয়ে কালার কো লিমিটেডের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

কারখানা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়ায় শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের বক্তব্য

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, ঘটনার পর শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন এবং পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তিনি জানান,

“পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।”

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্তে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শ্রমিকদের দাবি

লিজা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মী শ্রমিকরা কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত;
  • দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা;
  • অসুস্থ শ্রমিকদের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
  • অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপ কমানো;
  • শ্রমিকদের নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।

নতুন করে আলোচনায় শ্রমিক অধিকার

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও দেশের পোশাক খাতে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অসুস্থ কোনো শ্রমিককে প্রয়োজনীয় সহায়তা না দেওয়া হলে তা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, গাজীপুরের শ্রীপুরে নারী শ্রমিক লিজা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, অসুস্থ অবস্থায় তাকে কাজ করানো হয়েছিল কি না এবং এ ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *