ইনসাইডার কাউনিয়া রিপোর্ট:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সেফুদা’ নামে ব্যাপক পরিচিত অস্ট্রিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি সিফাত উল্লাহ গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে হাসপাতালের একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি জানান, তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এরপর থেকেই তার অনুসারী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
ফেসবুক পোস্টে সিফাত উল্লাহ এক আবেগঘন বার্তায় লেখেন,
“আমার অবস্থা সংকটাপন্ন। আপনারা অনেকেই জানেন, আমার পৈতৃক সম্পত্তি দেশে যা আছে আমি একটি কলেজের নামে দিয়ে দিয়েছি। ইচ্ছে ছিল মায়ের নামে একটি হাসপাতাল করার। যদি আমি মারা যাই, আপনাদের কাছে শুধু দোয়া চাই। হয়তো আমার লাশ আমার প্রিয় বাংলাদেশে যাবে না। নেওয়ার মতো কেউ নেই। আমাকে সবাই ক্ষমা করুন।”
তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই পোস্টটি শেয়ার করে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। আবার অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে মন্তব্য করেছেন যে, একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে এমন একাকীত্বের কথা প্রকাশ করছেন, যা সত্যিই হৃদয়বিদারক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় এক নাম
সিফাত উল্লাহ, যিনি ‘সেফুদা’ নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক লাইভ, ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা, হাস্যরসাত্মক বক্তব্য এবং নানা বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আলোচনায় ছিলেন। তার ভিডিও ও লাইভ অনুষ্ঠানগুলো একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
বর্তমানে তার ফেসবুক অনুসারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি। তার অনুসারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও রয়েছেন।
অনেকেই তাকে বিনোদনের একটি ব্যতিক্রমী চরিত্র হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কেউ তার বক্তব্য ও উপস্থাপনাকে বিতর্কিত বলেও মনে করেন। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একটি পরিচিত ও আলোচিত নাম।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে স্ট্রোক করার পর থেকেই সিফাত উল্লাহর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে তিনি কোন রোগে আক্রান্ত এবং বর্তমানে তার চিকিৎসা কীভাবে চলছে, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
জীবন ও কর্ম
সিফাত উল্লাহ ১৯৪৬ সালের ৫ নভেম্বর খুলনার সোনাডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। যদিও তার পারিবারিক শিকড় চাঁদপুরে বলে জানা যায়।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার বড় ভাই শামছুল আলম মজুমদার। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়াও অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি অন্য পেশাতেও যুক্ত ছিলেন এবং একটি অনলাইন শপে খণ্ডকালীন কাজ করেছেন।
এছাড়া তার বড় ভাইয়ের দাবি অনুযায়ী, তিনি একসময় জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা (আইএলও)-তেও কাজ করেছেন।
প্রবাসজীবনের একাকীত্ব
পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ও এক সন্তান থাকলেও বর্তমানে তাদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি একাকী প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই তাকে নিজের একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলতে দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টেও সেই নিঃসঙ্গতার প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে তার এই বক্তব্য—
“হয়তো আমার লাশ আমার প্রিয় বাংলাদেশে যাবে না। নেওয়ার মতো কেউ নেই।”
এই কথাগুলো অনেক অনুসারীকেই আবেগাপ্লুত করেছে।
সম্পত্তি দান ও মানবিক পরিকল্পনা
নিজের পোস্টে সিফাত উল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, তার পৈতৃক সম্পত্তি তিনি একটি কলেজের নামে দান করে দিয়েছেন। পাশাপাশি তার ইচ্ছা ছিল মায়ের নামে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার।
যদিও তিনি কোন কলেজের নামে সম্পত্তি দান করেছেন বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কতদূর এগিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানা যায়নি।
ভক্তদের দোয়া ও উদ্বেগ
সিফাত উল্লাহর অসুস্থতার খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানিয়েছেন।
অনেকেই লিখেছেন, মতভেদ বা বিতর্ক থাকলেও একজন মানুষের অসুস্থতার সময়ে তার সুস্থতা কামনা করা মানবিক দায়িত্ব।
কেউ কেউ আবার তার জীবনের নানা স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, সেফুদা ছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক ব্যতিক্রমী চরিত্র, যিনি বহু মানুষকে হাসিয়েছেন এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা
এদিকে সিফাত উল্লাহর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি।
তার শারীরিক অবস্থার আরও উন্নতি বা অবনতির বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ ‘সেফুদা’ ওরফে সিফাত উল্লাহর সংকটাপন্ন অবস্থার খবর তার অনুসারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তার আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট অনেককে নাড়া দিয়েছে এবং প্রবাসজীবনের নিঃসঙ্গতার একটি বেদনাদায়ক চিত্রও সামনে এনেছে। এখন তার ভক্ত-অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের একটাই প্রত্যাশা—তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও সবার মাঝে ফিরে আসুন।
