ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক:
অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৮২ লাখ টাকা সরকারি ব্যয় নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
রোববার (২৮ জুন) বেলা ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে মিডিয়া ফ্রেমিং ও আমার ব্যাখ্যা’ শিরোনামে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি চিকিৎসা ব্যয়ের পুরো প্রক্রিয়া, আইনি ভিত্তি এবং নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
মিডিয়া রিপোর্টে বিভ্রান্তির অভিযোগ
ফেসবুক পোস্টের শুরুতেই আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম তার চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যাতে জনমনে বিভ্রান্তি ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
তার ভাষায়,
“গতকাল কয়েকটি অনলাইন মিডিয়া পোর্টালে আমার উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাবস্থায় চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সংবাদ আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সংবাদগুলোর মিডিয়া ফ্রেমিং নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তাই আমার যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি বলে মনে করছি।”
তিনি দাবি করেন, তার চিকিৎসা ব্যয়ের পুরো বিষয়টি আইনসম্মত এবং সরকার নির্ধারিত বিধি-বিধানের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
মন্ত্রীদের চিকিৎসা ব্যয়ের আইন কী বলে?
সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে মন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়টি ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
এই আইনের আওতায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা দেশে কিংবা বিদেশে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে তার সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় সরকারিভাবে বহনের বিধান রয়েছে।
তার দাবি, তিনি কোনো বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেননি; বরং আইনে যেটুকু প্রাপ্য, কেবল সেটুকুই গ্রহণ করেছেন।
বিদেশে চিকিৎসার কঠোর নিয়ম
আ ফ ম খালিদ হোসেন তার পোস্টে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াও ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন, কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টা বিদেশে চিকিৎসা নিতে চাইলে প্রথমে দেশের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই বোর্ড যদি লিখিতভাবে প্রত্যয়ন করে যে সংশ্লিষ্ট রোগের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেশে সম্ভব নয়, কেবল তখনই বিদেশে চিকিৎসার অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরকারপ্রধানের অনুমোদন নিতে হয়।
চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে প্রকৃত বিল, ভাউচার, রসিদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হয়। যাচাই-বাছাই শেষে সরকার সেই ব্যয় বহন করে।
দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে আক্রান্ত
নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে আ ফ ম খালিদ হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে জটিল হৃদরোগে ভুগছেন।
এছাড়াও তিনি উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং আরও বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতায় আক্রান্ত।
তিনি বলেন,
“আমি দিনে তিনবার ইনসুলিন গ্রহণ করি। ২০১৫ সালে আমার হার্টে স্টেন্ট বসানো হয়। এ পর্যন্ত পাঁচবার আমার এনজিওগ্রাম করা হয়েছে।”
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আবারও গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান।
পরীক্ষায় তার হৃদস্পন্দনের অনিয়মিত অবস্থা বা Atrial Fibrillation (AFib) ধরা পড়ে।
কেন বিদেশে যেতে হয়েছিল?
তিনি জানান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বোর্ড তাকে ‘ক্যাথেটার অ্যাবলেশন’ নামের জটিল অপারেশনের পরামর্শ দেয়।
কিন্তু চিকিৎসকরা জানান, এই অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি তখন দেশে উপলব্ধ ছিল না।
ফলে তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
চিকিৎসকরা আবুধাবির একটি মার্কিন হাসপাতাল এবং থাইল্যান্ডের বিখ্যাত বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের নাম সুপারিশ করেন।
প্রথম ধাপে ব্যয় ১৭ লাখ টাকা
পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে যান।
সেখানে পুনরায় এনজিওগ্রাম এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসকরা অপারেশনের পরামর্শ দিলেও পরীক্ষায় দেখা যায়, তার হৃদপিণ্ডের দেয়ালে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, অপারেশনের আগে ওষুধের মাধ্যমে ওই জমাট রক্ত অপসারণ করা জরুরি ছিল।
এ পর্যায়ে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং হাসপাতাল ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ১৭ লাখ টাকা খরচ হয়।
তিনি দাবি করেন, এই ব্যয়ের প্রতিটি রসিদ ও ভাউচার তিনি যথাযথভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন।
দ্বিতীয় ধাপে ৬৫ লাখ টাকার অপারেশন
পরবর্তীতে পবিত্র হজ পালন শেষে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দেশের চিকিৎসকদের পরামর্শে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিনি পুনরায় থাইল্যান্ডে যান এবং প্রয়োজনীয় অপারেশন সম্পন্ন করেন।
তিনি জানান, এই অপারেশনের জন্য বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
যদিও প্রকৃত বিল আরও বেশি ছিল, তবে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছু অর্থ ছাড় দেয়।
এ জন্য তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
সরকার কী কী ব্যয় বহন করেছে?
আ ফ ম খালিদ হোসেন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সরকার কেবল তার হাসপাতালের বিল, অপারেশন ব্যয় এবং ওষুধের খরচ বহন করেছে।
তার সঙ্গে যাওয়া সহযাত্রীর ব্যয়, হোটেল ভাড়া, যাতায়াত খরচ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ তিনি নিজেই বহন করেছেন।
তিনি বলেন,
“সরকার প্রদত্ত প্রতিটি পয়সার প্রকৃত বিল, ভাউচার ও রিসিপ্ট আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। যে কেউ চাইলে এসব ব্যয়ের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে পারবেন।”
আত্মসাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন,
“সরকারি কোনো অর্থ আত্মসাৎ কিংবা তসরুপ করা থেকে আমি নিজেকে বিরত রেখেছি। আইন অনুযায়ী যতটুকু আমার প্রাপ্য ছিল, কেবল সেটুকুই গ্রহণ করেছি।”
তার মতে, কিছু সংবাদমাধ্যম বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যাতে জনমনে অযথা সন্দেহ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনের তীব্র নিন্দা জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
৮২ লাখ টাকার চিকিৎসা ব্যয়ের তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এক পক্ষ বলছে, যেহেতু পুরো ব্যয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, তাই বিষয়টিকে বিতর্কিত করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষ মনে করছে, জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন এবং এ ধরনের ব্যয়ের বিস্তারিত সরকারি পর্যায়ে প্রকাশ করা উচিত।
এখন নজর সরকারি ব্যাখ্যার দিকে
আ ফ ম খালিদ হোসেনের ফেসবুক পোস্ট নতুন করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
যদিও তিনি দাবি করেছেন যে তার চিকিৎসা ব্যয় সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সরকার এই ব্যয় বহন করেছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়ে গেছে।
এখন বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আরও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসে কি না, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও সচেতন মহলের।
