ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর দেশের বাইরে অবস্থানের পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও আইনি বাধা উপেক্ষা করে তিনি চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফিরবেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তার দেশে ফেরা কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক পদ লাভের উদ্দেশ্যে নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।
তিনি বলেন,
“আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমার এই সংগ্রাম।”
দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয়
শেখ হাসিনা বলেন, জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি নানা ধরনের রাজনৈতিক সংকট ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে গেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পর দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটাতে হয়েছে তাকে। পরবর্তীতে দেশে ফিরে একাধিকবার রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাচেষ্টার মুখোমুখিও হয়েছেন।
তিনি বলেন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ বহু সংকট তিনি অতিক্রম করেছেন এবং মৃত্যুকে ভয় পান না।
তার ভাষায়,
“আমি বহু কঠিন সময় পার করেছি। জীবনের ঝুঁকি নতুন কিছু নয়। সব বাধা অতিক্রম করে আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরব।”
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ
আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন মামলার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়, বরং দেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি রাজনৈতিক দল।
তিনি দাবি করেন, নানা প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েও দলটি অতীতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও জনগণের সমর্থন নিয়ে আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে।
তিনি বলেন,
“আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়া বা অনুমতির ওপর নির্ভর করে না। এই দল জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে।”
‘ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন’
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। তবে জনগণের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার দাবি, দেশের সাধারণ মানুষ এখনো আওয়ামী লীগের আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ধারণার প্রতি আস্থাশীল।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর আঘাত এসেছে।
তিনি মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সব রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
গোপন সমঝোতার গুঞ্জন নাকচ
বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গোপন সমঝোতার গুঞ্জন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে তা নাকচ করে দেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির প্রশ্নে সবসময়ই জনগণের ওপর আস্থা রাখে এবং কোনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালনা করে না।
‘মন পড়ে থাকে বাংলাদেশেই’
ভারতে অবস্থান করলেও তার মন সবসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছেই পড়ে থাকে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।
তার বিশ্বাস, জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এবং দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা
শেখ হাসিনার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণার ফলে আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়েও আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রায় দুই বছর বিদেশে অবস্থানের পর চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ হিসেবেই তিনি দেশে ফিরতে চান এবং শেষ দিন পর্যন্ত সেই সংগ্রাম অব্যাহত রাখবেন।
