মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারকে করের আওতায় আনা নিয়ে উদ্বেগ যৌক্তিক, জনগণকে স্বস্তি দিতে হবে: সাকি

ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক

মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারকে করের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে, তা যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। তিনি বলেছেন, নতুন কর ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যাতে অতিরিক্ত চাপের মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুদি দোকান, কাঁচাবাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে, নতুন কর ব্যবস্থা কোনোভাবেই ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার জন্য নয়।

তিনি বলেন,

“জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। করদাতাদের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিকভাবে ফ্ল্যাট রেটে কর নির্ধারণ করা হবে, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে না পড়েন।”

রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় আলাদা করার পরিকল্পনা

জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানান, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কারণে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই আমলাতন্ত্রের বাইরে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন নীতি-নির্ধারণী সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তার মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গঠন করা গেলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং রাজস্ব সংগ্রহ আরও কার্যকর হবে।

কর ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থান

প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি এবং অনিয়ম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন,

“দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে হলে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই।”

তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বাজেট নিয়ে উদ্বেগের জবাব

প্রস্তাবিত বাজেটের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাকি বলেন, বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে অনেক সংসদ সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বাজেটের আকার এবং অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় কর সংস্কার, প্রশাসনিক অটোমেশন এবং কর ফাঁকি রোধের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের বাজেট তুলনামূলক ছোট

সাকি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ।

তার মতে, প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এই হার ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন,

“আমাদের জনসংখ্যা, উন্নয়ন চাহিদা এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্য বিবেচনায় বাংলাদেশের বাজেট এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট।”

তাই ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে বাজেটের আকার আরও বড় করার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি’ পেয়েছে সরকার

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে।

তার ভাষায়, দেশের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এটি সংকোচনমূলক নয়, প্রসারণশীল বাজেট

সাকি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটকে কোনোভাবেই সংকোচনমূলক বাজেট হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তার মতে, এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রসারণশীল বাজেট, যেখানে উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সরকার জনগণের কল্যাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির দাবি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অতীতের কর্মদক্ষতার কারণে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে তিনি দাবি করেন, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে গত চার মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে কর প্রশাসনে সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা কার্যকর ফল দিতে শুরু করেছে।

অটোমেশনে জোর দিচ্ছে সরকার

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত কর রেয়াতের কারণে সরকার প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব অনিয়ম বন্ধে কর প্রশাসনে দ্রুত অটোমেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)সহ আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে অটোমেশন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে।

তার আশা, প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা চালু হলে কর আদায় বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং করদাতারা আরও সহজ ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর প্রদান করতে পারবেন।

সব মিলিয়ে, মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারকে করের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ থাকলেও সরকার জনগণের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *