বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক | ইনসাইডার কাউনিয়া
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক ও শিল্পমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং কর্মসংস্থানমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারলে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।
রোববার (২৮ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত দিনব্যাপী নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন।
‘শুধু স্লোগান দিয়ে জাতি গড়ে ওঠে না’
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, একটি জাতি শুধু স্লোগান, মিছিল-মিটিং কিংবা আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী।
তিনি বলেন,
“বাংলাদেশের সামনে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই প্রস্তুত করতে হবে।”
তার মতে, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, কারণ তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
শিল্পমুখী শিক্ষার ওপর জোর
শিবির সভাপতি বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা মূলত শিল্পমুখী বা ইন্ডাস্ট্রি-ওরিয়েন্টেড। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন কোনো বিভাগ চালু করার আগে সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বিবেচনা করে।
তিনি বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর নতুন বিভাগ চালু করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়।”
বাংলাদেশেও একই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্নাতক সম্পন্ন করার আগেই কর্মক্ষেত্রের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে।
রেমিট্যান্স ও অর্থনীতি নিয়ে বক্তব্য
দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে রেমিট্যান্স।
তার দাবি অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। তবে এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করায় সরকার প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির কারণে প্রকৃত আয় তুলনামূলক কম থাকে।
প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের আহ্বান
বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তার মতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, পাইথন, সি++, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিকস এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তিনি বলেন,
“বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া বৈশ্বিক চাকরির বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।”
তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন প্রযুক্তি শেখা এবং নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, জনগণের করের টাকায় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। তাই তাদের দায়িত্ব কেবল নিজের ভবিষ্যৎ গড়া নয়; বরং পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
তিনি বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে একজন শিক্ষার্থী কেবল নিজের উন্নতির কথা ভাববে না, বরং সমাজের জন্যও অবদান রাখবে—এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।”
এ সময় তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব, মাদক, সহিংসতা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণ
দিনব্যাপী এই নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক এবং জাকসুর শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন।
এছাড়া প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, রাশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের ক্যান্ডিডেট অব সায়েন্স ড. মো. নূরুল হাসান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামান সাদী।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-এর সহ-সভাপতি (ভিপি) মো. রিয়াজুল ইসলাম।
কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ
অনুষ্ঠানের বক্তারা বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করার বিকল্প নেই। সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তব দক্ষতা অর্জন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তি অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ নবীনবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
