ইনসাইডার কাউনিয়া | শিক্ষা ডেস্ক
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে এবং তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক হলেন বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক মহাদেব রায়। অভিযোগ রয়েছে, দশম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগেই তিনি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এক শিক্ষার্থীর কাছে পাঠিয়ে দেন।
বুধবার (১ জুলাই) সকালে অনুষ্ঠিত দশম শ্রেণির ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষার পর বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আগে থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
প্রতিবেদকের হাতে থাকা স্ক্রিনশট অনুযায়ী, “Mahadev Sir” নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে এক শিক্ষার্থীর কাছে ইংরেজি প্রথম পত্রের একটি প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে একই প্রশ্ন অবিকল পাওয়া যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই মিল পাওয়ার পরই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার দশম শ্রেণির ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন প্রণয়ন করেন সহকারী শিক্ষক মহাদেব রায় নিজেই। বিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক প্রশ্ন প্রণয়ন, প্রিন্ট এবং সিলগালা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দেন। পরে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেই সিলগালা খাম খুলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়।
বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, যদি সত্যিই পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্ন বাইরে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে এর দায় প্রশ্ন প্রণয়ন ও সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর বর্তাতে পারে। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জি এম রুহুল আমিন বলেন, “মহাদেব বাবুর বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আমরা অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করব এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণের শামিল।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজিত সাহা বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা বিদ্যালয় পরিদর্শন করব এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোছা. রোকসানা বেগম এ বিষয়ে বলেন, “একজন শিক্ষক যদি প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে। তদন্তে সত্যতা মিললে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মহাদেব রায়ের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, একজন শিক্ষক সমাজে আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতীক। তাই কোনো শিক্ষক যদি এমন অভিযোগের মুখোমুখি হন, তাহলে তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। তাই এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অনিয়ম করার সাহস না পায়। একই সঙ্গে বিদ্যালয়গুলোতে প্রশ্ন প্রণয়ন, সংরক্ষণ এবং বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
