ইনসাইডার কাউনিয়া | ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের আওতায় বিতরণ করা সরকারি সহায়তা সামগ্রী নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। দরিদ্র, অসচ্ছল ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ করা বিভিন্ন উপকরণ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এডিপির বিশেষ বরাদ্দের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসচ্ছল মানুষের জন্য বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন, স্প্রে মেশিন, ছাগল, ফুটবল ও হুইলচেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব উপকরণ দরিদ্র শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে যে, প্রকৃত উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে সেগুলো বিতরণ করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা তাজুল ইসলাম। অভিযোগ অনুযায়ী, কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইমুন ইসলামের নামে বরাদ্দ হওয়া একটি বাইসাইকেল তিনি নিজেই গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, মাস্টাররোলে নিজে স্বাক্ষর করে সাইকেলটি নিয়ে পরে নিজের মেজো ছেলের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেন এবং তার নাতনিকে সেটি ব্যবহার করতে দেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সাইমুন ইসলাম জানায়, তার নামে একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ হলেও সেটি কখনো তার হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তার দাবি, তার জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য ব্যবহার করে অন্য কেউ সাইকেলটি গ্রহণ করেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঝিনাইদহ-৩) মতিয়ার রহমানের নির্দেশে বুধবার দুপুরে ওই বাইসাইকেল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেটি প্রকৃত উপকারভোগী সাইমুন ইসলামের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
এদিকে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত একটি বাইসাইকেল তিনি নিজের ছেলের নামে গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে তিনি ছেলের জন্য একটি সাইকেল চেয়েছিলেন এবং সেই সূত্রেই সেটি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানান বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে মাওলানা তাজুল ইসলাম প্রথমে দাবি করেন, সাইকেলটি তিনি প্রতিবেশী এক ছেলেকে দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন যে, তার মেজো ছেলে আর্থিক সংকটে থাকায় তিনি সাইকেলটি ছেলের মেয়েকে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, শুধু তিনি নন, বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের নেতারাই সরকারি বরাদ্দের বিভিন্ন মালামাল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ও সাবেক জামায়াত নেতা শের আলী। তিনি বলেন, “মাওলানা তাজুল ইসলাম কোনোভাবেই দরিদ্র নন। তিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, শহরে তার নিজস্ব বাড়ি রয়েছে এবং তার সন্তানরাও প্রতিষ্ঠিত। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা একটি বাইসাইকেল নিজের স্বজনকে দিয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নৈতিকতার পরিপন্থী।”
উপজেলা বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডলও অভিযোগগুলোকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে না গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকলে প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।”
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার বলেন, বাইসাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়ার পর সাইকেলটি ফেরত এনে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেলাই মেশিন, ছাগল, স্প্রে মেশিনসহ অন্যান্য সরকারি মালামাল বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সহায়তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু যদি রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে এসব সহায়তা অন্যদের হাতে চলে যায়, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন এবং সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় পুরো উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি বাইসাইকেল ফেরত দেওয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে কারা কারা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি মালামাল গ্রহণ করেছেন, তা চিহ্নিত করতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তাদের মতে, সরকারি সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
