নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো মমতাজকে, আদালত চত্বরে গেয়ে উঠলেন ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’

ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক রিপোর্ট

সাবেক সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী মমতাজ বেগমকে রাজধানীর মিরপুর থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় নতুন করে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার (২৪ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আলোচনায় উঠে আসেন এক সময়ের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও রাজনীতিক মমতাজ বেগম। তবে আদালতের কার্যক্রমের পাশাপাশি আদালত চত্বরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। আদালত থেকে বের করে আনার সময় তিনি নিজের জনপ্রিয় গান ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ গেয়ে ওঠেন, যা মুহূর্তেই উপস্থিত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর মিরপুর এলাকায় সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হক গত সোমবার আদালতে এ আবেদন জমা দেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর এলাকার সুইমিংপুল ও ফায়ার সার্ভিস রোড সংলগ্ন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মোক্তার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ হওয়ার পর তিনি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। তদন্তের একপর্যায়ে মামলায় মমতাজ বেগমের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়।

বুধবার শুনানির জন্য কারাগার থেকে মমতাজ বেগমকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত কক্ষে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আদালতের কাছে বলেন, মমতাজ বেগম সাবেক সরকারের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি আদালতকে জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি তৎকালীন সরকারের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রমে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কিছু তথ্য ও উপাত্ত পাওয়া গেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষ তাকে মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন জানায়।

রাষ্ট্রপক্ষের মতে, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো প্রয়োজন।

আসামিপক্ষের আপত্তি

অন্যদিকে মমতাজ বেগমের পক্ষে আইনজীবী আব্দুস সালাম মোল্লা গ্রেফতার না দেখানোর আবেদন করেন। তিনি আদালতের সামনে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মমতাজ বেগম ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত থেকে একাধিক মামলায় জামিন পেয়েছেন।

আইনজীবীর দাবি, নতুন এই মামলার এজাহারে মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা সরাসরি সম্পৃক্ততার বর্ণনা নেই। তিনি আরও বলেন, একই তারিখে দেশের বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।

তার প্রশ্ন ছিল, একই সময়ে একজন ব্যক্তি কীভাবে বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন? এ বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় নেওয়ারও অনুরোধ জানান তিনি।

আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা মমতাজ বেগমকে নতুন মামলায় জড়ানোর মাধ্যমে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের মতে, মামলার ঘটনাস্থল ও ঘটনার সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।

আদালতের সিদ্ধান্ত

উভয়পক্ষের বক্তব্য ও যুক্তিতর্ক শোনার পর আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন মঞ্জুর করেন। বিচারক মমতাজ বেগমকে সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালতের এই আদেশের মধ্য দিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো।

আদালত চত্বরে ব্যতিক্রমী মুহূর্ত

শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণে ঘটে যায় এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। আদালত থেকে মমতাজ বেগমকে বের করে আনার সময় তার হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং শরীরে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল।

এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত অনেকেই কৌতূহলবশত জানতে চান, “কে উনি?”

সেই মুহূর্তে মমতাজ বেগম নিজের কণ্ঠেই গেয়ে ওঠেন তার বহুল জনপ্রিয় গান ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’। তার এই আচরণে উপস্থিত অনেকেই বিস্মিত হন। কেউ কেউ মুচকি হাসেন, আবার কেউ তার গাওয়া গান গুনগুন করতেও শুরু করেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন মন্তব্য করেন, সংসদ সদস্য থাকাকালেও বিভিন্ন সময় গান গেয়ে আলোচনায় এসেছিলেন মমতাজ। আদালত চত্বরে তার এই আচরণ যেন সেই শিল্পীসত্তারই আরেকটি প্রকাশ।

সংগীত ও রাজনীতির দুই অঙ্গনে পরিচিত মুখ

মমতাজ বেগম বাংলাদেশের লোকসংগীত জগতের অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। তার গাওয়া অনেক গান গ্রামবাংলা থেকে শুরু করে শহুরে শ্রোতাদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

বিশেষ করে লোকগান, পালাগান এবং আধুনিক লোকধারার সংগীতে তার অবদান তাকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে।

সংগীতের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন।

দুই মেয়াদে সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নিজের পরিচিতি তৈরি করেন।

২০২৪ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী সময়

২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মমতাজ বেগম আবারও মানিকগঞ্জ-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে এবার তিনি জয়ী হতে পারেননি। স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে যায়।

পরবর্তীতে গত বছরের ১২ মে রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সময় থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

এরপর বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে আদালতে শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সামনে কী?

বর্তমানে মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। নতুন এই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ফলে তার আইনি লড়াই আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে চূড়ান্তভাবে কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তিনি অভিযুক্ত মাত্র। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

এদিকে আদালত চত্বরে তার গেয়ে ওঠা ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে একটি আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে পরিস্থিতির মধ্যে নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখার এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

সব মিলিয়ে, জনপ্রিয় শিল্পী থেকে সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে একাধিক মামলার আসামি—মমতাজ বেগমকে ঘিরে আলোচনার নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো এই আদালত কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। তার আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী ধাপ এবং মামলার অগ্রগতি এখন সবার নজরে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *