১৫ বছর পূর্ণ হলে এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার ভাবনা ইসির, বায়োমেট্রিক হালনাগাদে আসতে পারে নতুন নিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক | ইনসাইডার কাউনিয়া জাতীয় ডেস্ক

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ইস্যুর ১৫ বছর পূর্ণ হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে নবায়নের বিষয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে কমিশনের বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন ও বিধিমালায় এনআইডি নবায়নের বিধান আগে থেকেই রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি বাধ্যতামূলক নয়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে একজন নাগরিকের মুখাবয়ব, শারীরিক গঠন, ছবি এবং বায়োমেট্রিক তথ্যের পরিবর্তন হওয়ায় পরিচয় যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেন প্রয়োজন হতে পারে এনআইডি নবায়ন

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, ১৫ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এ সময়ের মধ্যে একজন মানুষের চেহারা, বয়সজনিত পরিবর্তন, ওজন, দাড়ি-গোঁফ, এমনকি আঙুলের ছাপের গুণগত মানেও পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত কারণে বা জেন্ডার পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিভিন্ন তথ্যেও পরিবর্তন ঘটে।

এ ছাড়া কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের চেহারা পরিবর্তন করলেও পুরোনো এনআইডির ছবির সঙ্গে বাস্তব চেহারার অমিল তৈরি হতে পারে। ফলে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ, পরিচয় যাচাই কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

আইনে কী বলা আছে

জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্রের মেয়াদ হবে ইস্যুর তারিখ থেকে ১৫ বছর।

একই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় উল্লেখ রয়েছে, পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বা পরে নবায়নের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করতে হবে।

অর্থাৎ আইনে নবায়নের বিধান থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ নাগরিক নির্ধারিত সময় শেষে এনআইডি নবায়ন করেন না। এবার সেই বিধানকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

বিধিমালায় কী রয়েছে

জাতীয় পরিচয়পত্র বিধিমালার ৫ নম্বর বিধি অনুযায়ী, এনআইডি নবায়নের জন্য নাগরিক বা তার আইনানুগ অভিভাবককে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে।

আবেদন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে অথবা কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে করা যাবে।

সরাসরি আবেদন করলে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে তার রশিদ আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। আবেদন ‘জরুরি’ অথবা ‘সাধারণ’—উভয় শ্রেণিতে করা যাবে।

অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রেও ফি পরিশোধের প্রমাণপত্র স্ক্যান করে জমা দিতে হবে।

জরুরি আবেদন কমিশনের নির্ধারিত দপ্তরে এবং সাধারণ আবেদন স্থানীয় নির্বাচন অফিসে জমা দেওয়া যাবে।

আবেদন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া

আবেদন জমা হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনটি যাচাই করবেন।

যদি কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ থাকে বা ভুল পাওয়া যায়, তাহলে আবেদনকারীকে তা সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া হবে।

সব তথ্য সঠিক থাকলে আবেদনকারীকে বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদের জন্য নির্ধারিত তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে।

বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদ

বিধিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে নির্ধারিত দিনে কমিশন বা স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান করতে হবে।

আইন অনুযায়ী বায়োমেট্রিক তথ্যের মধ্যে রয়েছে—

  • আঙুলের ছাপ
  • হাতের ছাপ
  • তালুর ছাপ
  • চোখের আইরিশ
  • মুখাবয়বের ছবি
  • স্বাক্ষর
  • কণ্ঠস্বর
  • ডিএনএ (প্রয়োজনে)

তবে বর্তমানে মূলত আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ, ছবি এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।

সব প্রক্রিয়া শেষ হলে পুরোনো এনআইডি জমা নিয়ে একই নম্বরে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করা হবে।

কতদিনে মিলবে নবায়ন করা এনআইডি

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী—

  • জরুরি আবেদন: ৭ কার্যদিবসের মধ্যে
  • সাধারণ আবেদন: ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে

নবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে নির্ধারিত ফি—

  • সাধারণ আবেদন: ১০০ টাকা
  • জরুরি আবেদন: ১৫০ টাকা

কী বলছেন নির্বাচন কমিশন সচিব

এনআইডি নবায়নের বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন,

“এটা হচ্ছেই। কেউ চাইলে যখন তখন এনআইডি নবায়নের আবেদন করতে পারেন। হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলেও নতুন এনআইডি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”

তবে ১৫ বছর পর বাধ্যতামূলক নবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন,

“বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, সেটাও আমরা ভেবে দেখছি। বিষয়টি নিয়ে কমিশনের মধ্যে আলোচনা চলছে।”

ফি ছাড়াই নবায়নের চিন্তাও রয়েছে

ইসি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, যদি বাধ্যতামূলক নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে ফি ছাড়াই নাগরিকদের এনআইডি নবায়নের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।

একজন কর্মকর্তা বলেন,

“১৫ বছরে একজন মানুষের ছবি, দাড়ি-গোঁফ, মুখাবয়ব এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে পরিচয় যাচাই কঠিন হয়ে যায়। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর এনআইডি হালনাগাদ করা প্রয়োজন।”

হারানো এনআইডির চেয়ে নবায়ন বেশি কার্যকর

বর্তমানে অধিকাংশ নাগরিক এনআইডি হারিয়ে গেলে অথবা কার্ড নষ্ট হলে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করেন।

কিন্তু সে ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় কেবল কার্ড পুনর্মুদ্রণ হয়; বায়োমেট্রিক তথ্য বা ছবি হালনাগাদ করা হয় না।

অন্যদিকে নবায়নের মাধ্যমে নতুন ছবি, আঙুলের ছাপ, আইরিশসহ প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হয়। ফলে পরিচয় যাচাই আরও নির্ভুল ও নিরাপদ হয়।

হারানো এনআইডির বর্তমান ফি

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী—

প্রথমবার হারালে

  • সাধারণ: ২০০ টাকা
  • জরুরি: ৩০০ টাকা

দ্বিতীয়বার হারালে

  • সাধারণ: ৩০০ টাকা
  • জরুরি: ৫০০ টাকা

তৃতীয়বার বা পরবর্তীতে

  • সাধারণ: ৫০০ টাকা
  • জরুরি: ১,০০০ টাকা

তুলনামূলকভাবে এনআইডি নবায়নের ফি কম হওয়ায় এটি নাগরিকদের জন্য আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

এখনো চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত

এ বিষয়ে এনআইডি মহাপরিচালক এএইচএম আনোয়ার পাশা বলেন,

“বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা শেষে কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।”

যা হতে পারে সামনে

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা অনুযায়ী, ১৫ বছর পর এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করা হলে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক, নির্ভুল ও নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বায়োমেট্রিক তথ্য হালনাগাদ হলে পরিচয় জালিয়াতি কমবে, সরকারি ও বেসরকারি সেবায় নাগরিক পরিচয় যাচাই আরও সহজ হবে এবং জাতীয় তথ্যভান্ডারের মানও উন্নত হবে।

তবে বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পরই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *