সন্তানকে পাশে রেখে গলায় ফাঁস দিলেন মা, শিশুর কান্নায় প্রকাশ পেল মর্মান্তিক ঘটনা

ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নে এক মর্মান্তিক ঘটনায় জান্নাতুল ফেরদৌস নয়ন (২২) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে নিজ ঘরে তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান স্বজনরা। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে তার এক বছর বয়সী শিশুসন্তানের উপস্থিতি স্থানীয়দের আবেগাপ্লুত করে তোলে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সী মাঝির পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস নয়ন একই এলাকার সৌদি আরবপ্রবাসী মনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। তাদের সংসারে এক বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই

স্থানীয় সূত্র এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে অন্য দিনের মতোই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নাশতা করেন নয়ন। তার আচরণেও কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

পরিবারের দাবি, সকাল ১০টার দিকে নয়নের শাশুড়ি পাশের একটি ক্ষেতে কাজ করতে যান। এ সময় নয়ন নিজ ঘরেই ছিলেন। কিছু সময় পর প্রতিবেশীরা বাড়ির ভেতর থেকে শিশুর অস্বাভাবিক কান্নার শব্দ শুনতে পান।

প্রতিবেশীদের একজন জানান, দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটির কান্নার শব্দ শোনার পর বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। এরপর দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন নয়নের শাশুড়ি।

ঘরে ঢুকেই দেখতে পান মর্মান্তিক দৃশ্য

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে ফিরে ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, নয়ন ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছেন। পাশেই ছিল তার একমাত্র শিশু সন্তান, যে অবিরাম কাঁদছিল।

খবরটি দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোক ও বিষাদের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই বলছেন, সকালে যার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন।

প্রবাসী স্বামীর পরিবারে বাস করতেন নয়ন

স্থানীয় ইউপি সদস্য মাস্টার দেলোয়ার হোসেন জানান, নিহত নয়নের স্বামী মনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি শাশুড়ির সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করতেন।

তিনি বলেন,

“ঘটনার আগে কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। হঠাৎ এমন ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা হতবাক হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসীর মধ্যেও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।”

স্থানীয়দের অনেকেই জানান, নয়নকে তারা শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবেই চিনতেন।

এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া

মর্মান্তিক এ ঘটনার পর মুন্সী মাঝির পাড়ায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, শিশুসন্তানকে রেখে এমন একটি ঘটনার খবর তাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,

“ঘটনার পর যখন শিশুটিকে দেখা যায়, তখন উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এমন ঘটনা আমাদের পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।”

স্থানীয়দের মতে, পরিবারের ওপর এই ঘটনার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে।

ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ

খবর পেয়ে সাতকানিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম শুরু করে।

সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান,

“খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। মরদেহ উদ্ধার করে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যার ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও সংগ্রহ করছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে সব দিক

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর পেছনে পারিবারিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হয়।

পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজন

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সংকটের বিভিন্ন বিষয় অনেক সময় মানুষের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক যোগাযোগ, মানসিক সহায়তা এবং একে অপরের প্রতি যত্নশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মনে হলে তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা উচিত।

এখন তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা

বর্তমানে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ কী ছিল, সেটিই জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্তের অগ্রগতি এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের এই ঘটনা পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে। বিশেষ করে এক বছর বয়সী শিশুসন্তানকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগঘন পরিস্থিতি স্থানীয়দের হৃদয় স্পর্শ করেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এখন সবার নজর পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের ফলাফলের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *