দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হির সাত বছরের কারাদণ্ড

ইনসাইডার কাউনিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ঘুষের বিনিময়ে বিলাসবহুল উপহার গ্রহণ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করার অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একই সঙ্গে তার কাছ থেকে জব্দ করা কোটি কোটি ওন মূল্যের মূল্যবান উপহার রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট বহুল আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির ইতিহাসে সাবেক কোনো ফার্স্ট লেডির বিরুদ্ধে এ ধরনের রায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায় ঘোষণার সময় বিচারক জো সুন-পিয়ো বলেন, রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যদের আচরণে সর্বোচ্চ সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন,

“রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংযম প্রদর্শন করা উচিত ছিল। কিন্তু কিম কিয়ন হি নিজের অবস্থান ও প্রভাব ব্যবহার করে একাধিকবার মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেছেন, যা জনগণের আস্থার পরিপন্থী।”

আদালতের মতে, উপহার গ্রহণের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত পর্যায়ের ছিল না; বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক ছিল।

কী কী অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত

বিশেষ কৌঁসুলির দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, কিম কিয়ন হি বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে দামি উপহার গ্রহণ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালে সিওহি কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান লি বং-কোয়ানের কাছ থেকে তিনি প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ ওন, অর্থাৎ প্রায় ৯০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের একটি হীরার নেকলেসসহ আরও বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল উপহার গ্রহণ করেন।

আদালত মনে করেন, এসব উপহার শুধু সৌজন্যবশত দেওয়া হয়নি; বরং সরকারি পদ, বিশেষ সুবিধা এবং প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই এগুলো প্রদান করা হয়েছিল।

যেসব মূল্যবান সামগ্রী বাজেয়াপ্ত হচ্ছে

আদালত কিম কিয়ন হির কাছ থেকে জব্দ করা একাধিক বিলাসবহুল সামগ্রী রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের হীরার নেকলেস
  • টিফানির ব্রোচ
  • ডিওরের বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ
  • সোনার কচ্ছপের মূর্তি সংরক্ষণের বাক্স
  • শিল্পী লি উফানের একটি চিত্রকর্ম
  • অন্যান্য মূল্যবান শিল্পকর্ম ও উপহারসামগ্রী

আদালতের মতে, এসব সামগ্রী বেআইনি সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলো রাষ্ট্রের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে।

আদালতে কিমের বক্তব্য

রায় ঘোষণার সময় ধূসর রঙের স্যুট এবং সাদা মাস্ক পরে আদালতে উপস্থিত হন কিম কিয়ন হি।

তিনি উপহার গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করলেও দাবি করেন, এগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার সম্পর্ক ছিল না।

তার বক্তব্য ছিল, উপহারগুলো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সৌজন্যের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি কোনো ধরনের বেআইনি সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে এগুলো গ্রহণ করেননি।

তবে আদালত তার এই যুক্তিকে গ্রহণ করেননি।

আইনজীবীদের আপিলের ঘোষণা

রায়ের পর কিমের আইনজীবীরা জানান, তারা এ রায়ে সন্তুষ্ট নন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

তাদের দাবি, পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই আদালত এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

আইনজীবীদের মতে, উপহার গ্রহণের ঘটনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

তারা আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে রায়ের পুনর্বিবেচনা হবে।

আরও যেসব অভিযোগে অভিযুক্ত

এই মামলার পাশাপাশি কিম কিয়ন হির বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলার বিচার চলছে।

এর আগে ইউনিফিকেশন চার্চের কাছ থেকে উপহার গ্রহণ এবং শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার অভিযোগে পৃথক মামলায় আপিল আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দামি ঘড়ি, শিল্পকর্ম, সোনার মূর্তি এবং প্রায় ১৪ কোটি ওন মূল্যের বিভিন্ন উপহার গ্রহণের অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিযুক্তকে স্থগিত কারাদণ্ড এবং একজনকে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই রায়কে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, আইন সবার জন্য সমান—এই রায় সেটিরই প্রতিফলন।

অন্যদিকে, কিমের সমর্থকদের একটি অংশ দাবি করছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে টার্গেট করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারব্যবস্থা অতীতেও একাধিক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের পরিস্থিতি

কিম কিয়ন হির স্বামী এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলও বর্তমানে একাধিক আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক আইন জারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি অভিশংসনের মুখোমুখি হন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট পদ হারান।

বর্তমানে তার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ, সামরিক আইন জারি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলার বিচার চলছে।

ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক এই ক্ষমতাধর দম্পতি এখন দেশটির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।

দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে নতুন বার্তা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিম কিয়ন হির বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

তারা বলছেন, রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব—এই বার্তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে এই রায় ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।

এখন নজর আপিলের দিকে

বর্তমানে সবার দৃষ্টি উচ্চ আদালতে কিম কিয়ন হির সম্ভাব্য আপিলের দিকে।

আপিল আদালত এ রায় বহাল রাখবেন নাকি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই এখন দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

সব মিলিয়ে, ঘুষের বিনিময়ে বিলাসবহুল উপহার গ্রহণ এবং প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কোটি কোটি ওন মূল্যের মূল্যবান উপহার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ এবং চলমান অন্যান্য মামলাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিবিরোধী লড়াই আগামী দিনগুলোতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *