ন্যায্য দাম না পেয়ে পুকুরে পেঁয়াজ ফেলছেন কৃষক, লোকসানের মুখে ফরিদপুরের চাষিরা

ইনসাইডার কাউনিয়া ডেস্ক:

উৎপাদনে ভালো ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা। বাজারে পেঁয়াজের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি না করে পুকুর, খাল কিংবা জলাশয়ে ফেলে দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন ছবি ও ভিডিও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমে মাঠে ভালো উৎপাদন হলেও সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ বাজারে পেঁয়াজের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকারও বেশি। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। অথচ বর্তমানে অনেক স্থানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

ফরিদপুরের একাধিক কৃষক জানান, অনেকেই ব্যাংক, এনজিও কিংবা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলনের কারণে তারা লাভের আশা করেছিলেন। কিন্তু বাজারে এসে সেই আশা ভেঙে গেছে। উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করেও খরচ উঠছে না। বরং বাজারে নিতে পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক খরচ যোগ হওয়ায় লোকসান আরও বাড়ছে।

কৃষক আবদুল হালিম বলেন, “মাসের পর মাস কষ্ট করে চাষ করলাম। এখন বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করলে খরচই উঠবে না। অনেক সময় ভাড়া দিয়েই লোকসান হয়ে যাচ্ছে। তাই কেউ কেউ পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন।”

আরেক কৃষক আবু বক্কর বলেন, “পেঁয়াজ চাষ করে আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। ভালো ফলন হয়েছে, কিন্তু দাম নেই। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক বস্তাভর্তি পেঁয়াজ পুকুরে ফেলে দিচ্ছেন। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষকের সামনে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি মৌসুমি বাজার সংকট নয়; বরং কৃষি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার প্রতিফলন। দেশে পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব, কৃষিপণ্য বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর তদারকির অভাবের কারণে প্রায়ই কৃষকরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার বাড়ানো জরুরি। কৃষক যদি কিছুদিন পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। পাশাপাশি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিপণ্য সংগ্রহের উদ্যোগও বাড়াতে হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে অনেকেই পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে আগামী মৌসুমে উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং তখন বাজারে আবারও পেঁয়াজের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে, যেখানে এক বছর দাম কম থাকায় কৃষক উৎপাদন কমিয়েছেন এবং পরের বছর বাজারে পেঁয়াজের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে বাজারে সরবরাহ বেশি, অন্যদিকে সংরক্ষণের সুযোগ কম থাকায় দাম কমে গেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে আসায় পাইকারি বাজারে মূল্য আরও কমে গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে পেঁয়াজ কিনে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রি করেন। কিন্তু উৎপাদক কৃষক সেই লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত হন। ফলে কৃষি উৎপাদনের মূল দায়িত্ব পালন করেও তারা আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এদিকে কৃষকদের দুর্দশার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহল দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কৃষকদের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত বাজার স্থিতিশীল করতে কোনো বড় ধরনের উদ্যোগের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিদের এই দুর্দশা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—যদি উৎপাদক কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে দেশের কৃষি উৎপাদন কতটা টেকসই থাকবে? কৃষকের ঘাম, শ্রম ও বিনিয়োগের সঠিক মূল্য নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে কৃষি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকরা বলছেন, তারা ভর্তুকি বা দান চান না; তারা শুধু তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য চান। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *