ইনসাইডার কাউনিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনা সেনাদের অনুপ্রবেশ এবং বিস্তৃত এলাকা দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় একটি সংগঠন দাবি করেছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কয়েক বছর ধরে ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি অংশে অবস্থান করছে এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোও নির্মাণ করেছে। তবে এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
স্থানীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (এনডব্লিউএস) সম্প্রতি অভিযোগ করে যে, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনা বাহিনী ধীরে ধীরে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের চারণভূমি, কৃষিজমি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত শিকারক্ষেত্রের একটি বড় অংশ বর্তমানে চীনা সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, চীনা বাহিনী শুধু সীমান্তে টহল বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা ওই এলাকায় সড়ক, অস্থায়ী ও স্থায়ী সামরিক ক্যাম্প এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। এতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর নতুন করে অনুপ্রবেশ বা ভারতীয় ভূখণ্ড দখলের যে দাবি করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেনাবাহিনীর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর উভয় দেশের টহল কার্যক্রমের কারণে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। তবে সাম্প্রতিক অভিযোগের ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো অনুপ্রবেশ বা ভূখণ্ড দখলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যের একটি বড় অংশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে এসেছে যে, অরুণাচল প্রদেশ দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
গত কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। ওই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
এরপর থেকে দুই দেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামরিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা হলেও সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, অরুণাচল প্রদেশে নতুন করে উত্থাপিত এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে। যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযোগটি অস্বীকার করেছে, তবুও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনা কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত-চীন সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত সীমান্তগুলোর একটি। প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের বিভিন্ন অংশে উভয় দেশের দাবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সময়ে সময়েই অনুপ্রবেশ, টহল কার্যক্রম এবং সীমান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে আসে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ স্থানীয় সংগঠনের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, আবার অনেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বক্তব্যের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই দুই দেশের উচিত কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং বিদ্যমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।
বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযোগ নাকচ করলেও স্থানীয় পর্যায়ের দাবি এবং সীমান্ত এলাকার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে নতুন এই অভিযোগ আবারও ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের স্পর্শকাতর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি এবং উভয় দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
