ইনসাইডার কাউনিয়া | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারত ভ্রমণের কয়েক বছর পর এক ব্রিটিশ নারীর মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী শনাক্ত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি এবং বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যায় ভোগার পর চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্কে বিরল ধরনের একটি পরজীবী সংক্রমণ শনাক্ত করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ রোগের নাম নিউরোসিস্টিসারকোসিস (Neurocysticercosis), যা শূকরের ফিতাকৃমি বা টেনিয়া সোলিয়াম (Taenia solium)-এর লার্ভা দ্বারা সৃষ্ট।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের কার্ডিফ শহরের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান (৪২) ২০০৭ সালে বন্ধুদের সঙ্গে ভারত ভ্রমণে যান। কয়েক সপ্তাহের সেই ভ্রমণ শেষে তিনি দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন এবং তখন তার শরীরে কোনো গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়নি।
তবে প্রায় চার বছর পর হঠাৎ করেই তার শরীর থেকে প্রায় এক মিটার দীর্ঘ একটি টেপওয়ার্ম বা ফিতাকৃমি বেরিয়ে আসে। প্রথমে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে মনে করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। তিনি তীব্র মাথাব্যথা, বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া এবং খিঁচুনির মতো সমস্যায় ভুগতে থাকেন।
পরবর্তীতে চিকিৎসকদের পরামর্শে তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্ক্যান করা হলে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। স্ক্যানে দেখা যায়, তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানে মোট ৩৮টি পরজীবী অবস্থান করছে। এ ঘটনা চিকিৎসকদেরও বিস্মিত করে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নিউরোসিস্টিসারকোসিস এমন একটি রোগ, যা সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করা ফিতাকৃমির ডিম থেকে সৃষ্টি হয়। এসব ডিম শরীরে প্রবেশ করার পর লার্ভায় পরিণত হয় এবং রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, চোখ, পেশি কিংবা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে পৌঁছে যেতে পারে।
মস্তিষ্কে এসব লার্ভা প্রবেশ করলে রোগীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বারবার খিঁচুনি হওয়া,
- তীব্র মাথাব্যথা,
- স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা,
- মানসিক বিভ্রান্তি,
- আচরণগত পরিবর্তন,
- উদ্বেগ ও বিষণ্নতা,
- কিছু ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, লোরি ডেনম্যানের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে এই সংক্রমণ বিস্তার লাভ করেছিল। ফলে রোগটি শনাক্ত হতে বেশ সময় লেগে যায়।
পরজীবীগুলো নির্মূল করার জন্য তাকে দীর্ঘ সময় ধরে জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-প্যারাসাইট ওষুধ, স্টেরয়েড এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসার সময় তিনি শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিকভাবেও কঠিন সময় পার করেছেন।
গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লোরি বলেন, প্রথমদিকে তিনি বুঝতেই পারেননি যে তার শরীরে এত বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল।
বর্তমানে তিনি অনেকটাই সুস্থ আছেন এবং খিঁচুনিমুক্ত জীবনযাপন করছেন। তবে এখনো তাকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হচ্ছে এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে তুলে ধরে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউরোসিস্টিসারকোসিস বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে যেখানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল এবং খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের কারণে বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের মানুষই এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। যেমন—
- সবসময় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করা,
- খাবার ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া,
- হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা,
- অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্রস্তুত করা খাবার এড়িয়ে চলা,
- বিদেশ ভ্রমণের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
তারা আরও পরামর্শ দিয়েছেন, বিদেশ ভ্রমণের পর যদি কারও মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা, অজানা কারণে খিঁচুনি, স্মৃতিশক্তির সমস্যা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি বিরল ঘটনা হলেও লোরি ডেনম্যানের অভিজ্ঞতা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ছোট বলে মনে হওয়া কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা কখনো কখনো বড় জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই যেকোনো অস্বাভাবিক উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
