ডেস্ক রিপোর্ট:
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম স্থানীয় সংবাদ পরিবেশনে সক্রিয় হলেও, এসবের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশ, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং ব্যক্তি ও সংগঠনের মানহানির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক মহল, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি Mirbag TV নামের একটি অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চ্যানেলটি “১৬ বছরের কিশোরীকে পালানোর অভিযোগে ছাত্রদল নেতা আটক” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদটি প্রকাশের পরপরই কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতারা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা দাবি করেন, যাকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তিনি সংগঠনের কোনো পর্যায়ের নেতা বা কর্মী নন এবং তার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি পরিষ্কার করতে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন নেতারা।
কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, যথাযথ তথ্য যাচাই না করেই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, যা সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এবং জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। তাদের ভাষ্য, সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করা। কিন্তু এসব নীতির তোয়াক্কা না করেই সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
তাদের আরও দাবি, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোনো ভুল তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হলেও প্রাথমিকভাবে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ভুল তথ্য প্রচার করে ব্যক্তি বা সংগঠনের সুনাম ক্ষুণ্ন করার দায় সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে বহন করতে হবে।
এদিকে সমালোচনার মুখে Mirbag TV পরবর্তীতে তাদের প্রকাশিত তথ্যে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, ভুল স্বীকার করা ইতিবাচক হলেও সংবাদটি ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর ফলে সংগঠনের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই শুধুমাত্র ভুল স্বীকার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, অনলাইন সাংবাদিকতার প্রসার তথ্যপ্রবাহকে সহজ ও দ্রুত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ পরিবেশন, যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার এবং ক্লিকবেইট শিরোনামের প্রবণতাও বেড়েছে। এতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নানা ধরনের হয়রানি ও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে।
তারা বলেন, সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভুল সংবাদ সমাজে বিভ্রান্তি, উত্তেজনা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে।
স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, কাউনিয়ায় গড়ে ওঠা কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শুধুমাত্র ভিউ ও প্রচারের আশায় যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করছে, যা প্রকৃত সাংবাদিকতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে পেশাদার সাংবাদিকতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতারা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে তথ্য যাচাইয়ে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির এই যুগে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার চর্চাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি সংগঠনের সুনাম নষ্টই করে না, বরং সমাজে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের পরিবেশও তৈরি করতে পারে।
