ইনসাইডার কাউনিয়া রাজনৈতিক ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অতীত ভূমিকা। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কাছে জাতির উদ্দেশে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানোর পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীতে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগ তুলে জামায়াতের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করার আগে বিএনপিরই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তার দাবি, যারা অতীতে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বানানোর মাধ্যমে বিএনপিও সেই রাজনৈতিক দায় এড়াতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মীমাংসিত অধ্যায়। এ বিষয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে দেশের গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে আমাদের উচিত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। জনগণ এখন তাদের অধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যায়বিচার চায়। অতীতের বিতর্ককে কেন্দ্র করে বিভাজনের রাজনীতি দেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।”
বিএনপির উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যাদের স্বাধীনতার বিরোধী বলা হয়, তাদের কেন পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বানানো হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর আগে বিএনপিকেই দিতে হবে। যারা এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদেরও রাজনৈতিক দায় রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রয়োজন কিংবা সুবিধাবাদের কারণে ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে বিভিন্ন সময় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে বর্তমান প্রজন্ম অতীতের রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ দেখতে চায়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ৩৬ দিনের বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। দলটির নেতারা জানান, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তারা জনগণের কাছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরবেন এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক দোষারোপের পরিবর্তে গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের জনগণ এখন এমন রাজনীতি চায়, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকবে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে দলটির কাছে জাতির উদ্দেশে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইতিহাসের কিছু অধ্যায় নিয়ে এখনো মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে এবং সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন।
এরই জবাবে পাল্টা বক্তব্য দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা মতামত প্রকাশ করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বিভিন্ন দলের অতীত ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও আলোচনার বিষয়। নির্বাচন, জাতীয় সংকট বা বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বিতর্ক প্রায়ই সামনে আসে। তবে ইতিহাসের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক সমঝোতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
এদিকে জামায়াত ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হলেও এ বিষয়ে দুই দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনার উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগামী দিনগুলোতে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
